
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হক ও অফিসের একাধিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। সরকারি ফি পরিশোধের পরও দলিল নিবন্ধন, নকল উত্তোলনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী দাতা-গ্রহীতা ও দলিল লেখকরা। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে দলিলে স্বাক্ষর করতে গড়িমসি করা হয়। কখনো কখনো কাগজপত্রে ত্রুটি দেখিয়ে দলিল ফেরত দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।গোপন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, অতিরিক্ত টাকা দেওয়া দলিলগুলোতে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে এজলাসে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে দলিল ফেরত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বারাইপুর গ্রামের মজিবুল হক অভিযোগ করে বলেন, তাঁর একটি দলিলে দাগসংক্রান্ত সামান্য ভুলের কারণে সাব-রেজিস্ট্রার ও তাঁর অফিস সহকারীকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আরেক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, নিজের পেশাগত পরিচয় চিকিৎসক হিসেবে দেওয়ার পরও একটি দলিল নিবন্ধনের জন্য সরকারি খরচের বাইরে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা দিতে হয়েছে।দলিল লেখক সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সদস্যের অভিযোগ, সাধারণ দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি পরিশোধের পরও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। আমমোক্তারনামা ও দানপত্রের মতো বিশেষ দলিলের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, হেবা ঘোষণাপত্র ও কমিশন দলিলের ক্ষেত্রেও জমির মূল্য অনুযায়ী প্রতি লাখে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। সরকারি ফি তুলনামূলক কম হলেও কোনো কোনো দলিলের জন্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। এ ছাড়া বায়নাপত্রে জমির যে মূল্য দেখানো হয়, মূল দলিল নিবন্ধনের সময় তার চেয়ে কয়েক গুণ কম মূল্য দেখিয়ে সরকারি কর ফাঁকির অভিযোগও উঠেছে। এমনটি ঘটে থাকলে সরকার রাজস্ব হারাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নথি বা রাজস্ব ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়নি। দলিলের নকল উত্তোলনেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি ফি ২৭০ টাকা হলেও একটি নকল পেতে প্রায় দুই হাজার টাকা দিতে হয়। সাব-কবলা দলিলের ক্ষেত্রে দলিলের মূল্য অনুযায়ী সেরেস্তা বাবদ আড়াই হাজার টাকা থেকে শুরু করে প্রতি লাখে অতিরিক্ত ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁরা। ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, বিনিময় দলিল নিবন্ধনে ব্যাংক চালানের মাধ্যমে সরকারি ফি পরিশোধের পরও অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। বণ্টননামা ও অসিয়ত দলিলের ক্ষেত্রেও দলিলের মূল্যের ওপর অতিরিক্ত এক শতাংশ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নকলের আবেদনের পর দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত স্বাক্ষর না করার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। এতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সোনাইমুড়ী দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দলিলের ক্ষেত্রে পে-অর্ডার বাদে দুই শতাংশ অর্থ হাতে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এর বাইরে নগদ অর্থ নেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে তাঁরা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন। অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে অফিস থেকে দলিল লেখকদের বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগকারীদের দাবি, অফিস সহকারী মোল্লার মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন করা হয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে, সোনাইমুড়ী সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হকের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে কল করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সংবাদ, কলাম, তথ্য বা ছবি ব্যবহার করা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
Leave a Reply