1. online@cnbtvbd.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. wpsvc_6eb0338d2040@wordpress-svc.internal : wpsvc_6eb0338d2040 :
  3. admin@cnbtvbd.com : admin :
August 24, 2026, 12:54 am

ফিরে দেখা ১০ জুলাই: ‘বাংলা ব্লকেডে’ থমকে যায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : শুক্রবার, জুলাই ১০, ২০২৬
  • 86 Time View

সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইজুড়ে চলা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ১০ জুলাই। ওই দিন (বুধবার) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব বিভাগীয় শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক এলাকায় সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক এবং রেললাইন অবরোধের ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়লেও আন্দোলনকারীরা দাবি আদায়ে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে না নেওয়ায় আন্দোলন আরও বেগবান করার সিদ্ধান্ত নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ১০ জুলাইয়ের কর্মসূচি শেষে আন্দোলনের সমন্বয়করা পরদিন বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সারাদেশে আবারও ‘বাংলা ব্লকেড’ পালনের ঘোষণা দেন। রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আয়োজিত সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

তিনি বলেন, ‘পরদিন বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে কর্মসূচি শুরু হবে এবং একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে বাংলা ব্লকেড সফল করবেন।’

১০ জুলাইয়ের বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন। সকাল ১০টার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এলাকায় সমবেত হন। সেখান থেকে তারা কোটাবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে শাহবাগের দিকে মিছিল নিয়ে যান। পরে আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে অবস্থান নেন।

শাহবাগ মোড়কে কেন্দ্র করে আশপাশের একাধিক সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, ফার্মগেট, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, শিক্ষা চত্বর, মৎস্য ভবন, চানখাঁরপুল, বঙ্গবাজারসহ রাজধানীর অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন।

শাহবাগে সমাবেশে শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির সব গ্রেডে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রেখে পুরো কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার করে আইন প্রণয়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, কোটাব্যবস্থা এমন হতে হবে যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার না হন এবং নিয়োগ ব্যবস্থায় সমতা নিশ্চিত হয়।

এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে পরবর্তী শুনানির জন্য ৭ আগস্ট দিন নির্ধারণ করা হয়। রায় ঘোষণার সময় প্রধান বিচারপতি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।

তবে আপিল বিভাগের এ আদেশ আন্দোলনকারীদের কর্মসূচিতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা জানান, আদালতের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তাদের মূল দাবি ছিল কোটাব্যবস্থার স্থায়ী ও যৌক্তিক সংস্কার নিশ্চিত করা। সে কারণে তারা পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অবস্থান চালিয়ে যান।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার সংলগ্ন রেললাইনে অবস্থান নিয়ে রেল চলাচল বন্ধ করে দেন আন্দোলনকারীরা। প্রায় এক ঘণ্টার অবরোধের কারণে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে ওই এলাকায় বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেলসহ প্রায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট, নূর হোসেন চত্বর ও পল্টন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। সকাল থেকেই তারা ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা মহাখালী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ রাখেন।

রাজধানীর বাইরে আন্দোলনের বিস্তার ছিল আরও ব্যাপক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজশাহী অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করেন। সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নেন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ময়মনসিংহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নেন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রংপুরের মডার্ন মোড় অবরোধ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা দেওয়ানহাটসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করেন।

এ ছাড়া পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়ক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-পটুয়াখালী মহাসড়ক অবরোধ করেন। একই সময়ে বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।

কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে ১ জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা ১০ জুলাই টানা চতুর্থ দিনের মতো ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ছাত্রধর্মঘট পালন করেন। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে না গিয়ে মিছিল, সমাবেশ ও অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেন। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

দিনভর কর্মসূচির মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকেও আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

একই বিষয়ে আপিল বিভাগের আদেশের ব্যাখ্যা দিয়ে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, আপিল বিভাগ স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলেছেন। অর্থাৎ বিদ্যমান অবস্থাই বহাল থাকবে। ২০১৮ সালের পরিপত্রের ভিত্তিতে যেসব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোটা থাকছে না। তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আদালতের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রেখে কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

তবে এসব আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা স্পষ্ট করেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় ১০ জুলাইয়ের বাংলা ব্লকেড শেষ হওয়ার আগেই পরদিন নতুন করে একই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। ফলে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আন্দোলন আরও নতুন মাত্রা পায় এবং পরবর্তী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তি তৈরি হয়।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের ইতিহাসে ১০ জুলাই তাই শুধু একটি অবরোধ কর্মসূচির দিন নয়, বরং এমন একটি দিন, যেদিন রাজধানী থেকে জেলা শহর, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহাসড়ক, সড়ক থেকে রেললাইন পর্যন্ত একই দাবিতে শিক্ষার্থীদের সমন্বিত উপস্থিতি দেশজুড়ে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি সেদিন বাংলাদেশের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থামিয়ে দিয়েছিল এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছিল।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সংবাদ, কলাম, তথ্য বা ছবি ব্যবহার করা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Design By Raytahost