
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের শিকার হয়ে লিমা সরকার (নাম) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার প্রধান আসামি নিহতের স্বামী শিমুল চন্দ্র সরকারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটেছে পার্বতীপুর উপজেলার আনন্দবাজার চাচেয়াখামার গ্রামে। নিহত লিমা সরকার নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জ ইসলামপুর গ্রামের উকিল চন্দ্র সরকারের মেয়ে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে আনন্দবাজার চাচেয়াখামার গ্রামের মৃত সুধীর চন্দ্রের ছেলে শিমুল চন্দ্র সরকারের সঙ্গে লিমার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে লিমার বাবা নগদ সাড়ে ৩ লাখ টাকা, ৪ ভরি স্বর্ণালংকার, একটি ডিসকভার মোটরসাইকেল ও আসবাবপত্রসহ প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার টাকার মালামাল দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই শিমুল চন্দ্র জুয়া খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েন। জুয়ায় টাকা হারিয়ে তিনি স্ত্রীকে বাবার বাড়ি থেকে আরও টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দিতেন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে লিমাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। একপর্যায়ে স্বামীর পরিবারের সদস্যদের প্ররোচনায় লিমাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় লিমার মা বাদী হয়ে দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। পরে দুই পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে লিমাকে আবার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৩ নভেম্বর রাতে লিমার কাছে আবারও ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে স্বামী শিমুল চন্দ্র, শাশুড়ি, ননদ মিনতি রানী ও চন্দনা রানী, ননদের স্বামী প্রফুল্ল চন্দ্র সরকার ও বিকাশ চন্দ্র এবং মামা শ্বশুর রথি কান্ত রায়সহ কয়েকজন মিলে লাঠি ও রড দিয়ে তাঁকে মারধর করেন। একপর্যায়ে ব্লেড দিয়ে তাঁর দুই হাতের কব্জির রগ কেটে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় লিমার বাড়িতে একজন স্থানীয় চিকিৎসককে ডেকে আনা হয়। তিনি লিমার দুই হাতে সেলাই ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেন বলে জানান। পরদিন ৪ নভেম্বর স্বজনরা খবর পেয়ে শিমুলের বাড়িতে গেলে তাঁদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পার্বতীপুর মডেল থানার মধ্যপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। পুলিশের সহায়তায় লিমাকে উদ্ধার করে প্রথমে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ বিষয়ে পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল ওয়াদুদ জানান, এজাহারে উল্লেখিত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি নিহতের স্বামী শিমুল চন্দ্র সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদিকে নিহতের বাবা উকিল চন্দ্র সরকার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর একমাত্র মেয়েকে যারা হত্যা করেছে, তিনি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। লিমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া স্থানীয় চিকিৎসক চঞ্চল সরকার জানান, তিনি লিমার দুই হাতের কাটা স্থানে সাত-আটটি সেলাই করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, ওই এলাকায় ক্যাসিনো ও তাসের জুয়ার আসর রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, জুয়ায় অর্থ হারানোর পর আরও ১০ লাখ টাকা যৌতুক চাওয়াকে কেন্দ্র করেই লিমার ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর অভিযুক্ত পরিবারের অন্য সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে থাকায় তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সংবাদ, কলাম, তথ্য বা ছবি ব্যবহার করা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
Leave a Reply