
শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে, অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে’—আশির দশকের শেষ দিকে ‘ডিফ্রেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের এই শ্রোতাপ্রিয় গান চার দশক পর আবার ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মুখে মুখে। তবে এবার নিছক বর্ষাবন্দনা বা রোমান্টিসিজম নয়, সিলেটের এক শিক্ষিকাকে সোশাল মিডিয়ায় ‘বুলি’ করার জবাব দিতে দেশজুড়ে শিক্ষকরা এই গানকে বানিয়ে নিয়েছেন নিজেদের প্রতিবাদের হাতিয়ার। প্রায় চার দশকের পুরনো সেই গান যে হুট করে এমন ‘অভূতপূর্ব’ রূপ নেবে, তা ভাবতে পারেননি গানটির গায়ক মেজবাহ রহমান। তিনি গ্লিটজকে বলেন, “আমাদের এই গানটি যে অন্যায্য সমালোচনার বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব সামাজিক আন্দোলন হয়ে উঠবে, এটা কখনো ভাবিনি। আমাদের গানটি মূলত প্রকৃতিকে নিয়ে তৈরি। তবে এটা এখন যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে গানটি এখন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।” ঘটনার সূত্রপাত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিও ঘিরে। নীল শাড়ি পরে আঁচল উড়িয়ে তার হাঁটার একটি রিল ভিডিওতে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি ব্যবহার করার পর অনলাইনে তিনি ট্রলের শিকার হন। এরপরই সারা দেশের শিক্ষিকারা ওই একই গান ব্যবহার করে নানা ভিডিও পোস্ট করে বিউটি রাণীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করা শুরু করেন। সমাজ ও সোশাল মিডিয়ার এই প্রবণতা নিয়ে হতাশার পাশাপাশি বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন মেজবাহ। তিনি বলেন, “সোশাল মিডিয়া অবারিত হওয়ার পর থেকেই দেখা যায়, একেবারে নির্মল ও সুস্থ কনটেন্টেও অনেকে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এটি সমাজ বা মানুষের স্বভাবগত বা সহজাত এক প্রবৃত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভালো-খারাপ হাত ধরাধরি করেই চলবে, এগুলো নিয়ে খুব একটা অতটা ভাবার কিছু নেই।” মেজবাহর ধারণা, বর্ষাকালে নিজের আবেগ থেকেই শিক্ষক বিউটি রাণী হয়ত গানটি ব্যবহার করেছিলেন। “কিন্তু পরে সবাই তার প্রতি সংহতি জানাতে গানটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। তারা গান ভালোবেসে ব্যবহার করছেন, নাকি প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে, সেটি যার যার বিষয়। কারণ আমাদের গানটি তো মূলত প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে তৈরি করা নয়।” তারপরও গানটি তরুণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন করে পৌঁছে যাওয়াকে ‘বড় প্রাপ্তি’ হিসেবেই দেখছেন এর গায়ক। ডিফ্রেন্ট টাচের নতুন কাজের খবরও জানিয়েছেন মেজবাহ রহমান। তিনি বলেন, “নতুন কিছু গানের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ৩-৪টি গানের কাজ শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই দুটো গান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রিলিজ করা হবে। পরে ৭-৮টি গান জমা হলে আমরা একটি অ্যালবাম ও প্রকাশনা উৎসবের পরিকল্পনা করব।” প্রথম অ্যালবামের বিশাল সাফল্যকে অতিক্রম করাটা চ্যালেঞ্জিং হলেও নতুন সৃষ্টি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী এই শিল্পী।মেজবাহ্ বলেন, “প্রথম অ্যালবাম এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে সেটাকে অতিক্রম করা বেশ কঠিন। পরেও আমরা বেশ কিছু গান রিলিজ করেছি, কিন্তু ওই গানটি ছড়িয়ে যেতে পারিনি৷ “তবে আমাদের বিশ্বাস, দীর্ঘ সময় পর নতুন যে গানগুলো আমরা রিলিজ করতে যাচ্ছি, শ্রোতারা তা খুব ভালোভাবে নেবেন।” শ্রাবণের মেঘগুলো গানের কথা লিখেছেন আশরাফ বাবু। ফেইসবুকে এক পোস্টে এই গীতিকার লিখেছেন, “প্রিয় বন্ধুরা। একজন শিক্ষিকা শুধু জ্ঞান দেন না, তিনি ভবিষ্যৎ গড়েন। তিনিও একজন মানুষ—তারও স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার আছে। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভুল বিচার করা তার সম্মান ও পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। “‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের গীতিকার ও সুরকার হিসেবে আমি সকল শিক্ষিকার সম্মান, স্বাধীনতা ও মানবিক অধিকারের পক্ষে আছি। আসুন, সম্মান ও মানবিকতাকেই আমাদের পরিচয় করি।” ১৯৮৭ সালে প্রকাশ পায় ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি। ‘ডিফ্রেন্ট টাচ’ প্রথম অ্যালবামের শেষ গান ছিল এটি৷ অ্যালবামটি প্রকাশ করেছিল ইলেকট্রা ভয়েস। গানটি প্রথম গেয়েছিলেন আলী আহমেদ বাবু। এরপর অ্যালবামের জন্য গেয়েছেন ব্যান্ডের অন্যতম ভোকাল মেজবাহ রহমান।
পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সংবাদ, কলাম, তথ্য বা ছবি ব্যবহার করা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
Leave a Reply