
ইয়েমেনের হুথিদের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে তুরস্ক। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, সৌদি আরবের সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত বিষয়ে সহায়তা চাইলে তা দিতে আঙ্কারার কোনো আপত্তি নেই।তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন সৌদি আরব-তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রথম বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।গত ৭ আগস্ট তিন দেশ ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির মূল কথা হলো, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই ব্যবস্থা ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গত শনিবার তুর্কি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাকান ফিদান সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর হামলার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হুথিদের চলমান হামলার কারণে সৌদি আরবের কিছু সামরিক প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কিছু প্রযুক্তিগত বিষয়ে সৌদি আরব সহায়তা চাইতে পারে। এসব প্রয়োজন পূরণে তুরস্কের কোনো সমস্যা হবে না বলেও জানান তিনি। তবে তুরস্ক ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে পারে, তা স্পষ্ট করেননি ফিদান।ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী তুরস্ক এরই মধ্যে হুথিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। হামলা দ্রুত বন্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছে তারাটি।
সৌদি আরবের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন মিত্রদেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ছে বলে দাবি করেছেন কিংস কলেজ লন্ডনের জ্যেষ্ঠ গবেষক নওয়াফ ওবেইদ। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, হুথিদের হুমকি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত সামরিক প্রতিক্রিয়া গড়ে উঠছে। তার দাবি, এই প্রতিক্রিয়া ধাপে ধাপে এগোবে। এতে স্থল, নৌ ও আকাশ—তিন ধরনের সামরিক সক্ষমতাই থাকতে পারে। সৌদি আরবে অস্ত্রব্যবস্থা সরানো এবং লোহিত সাগরে যুদ্ধবিমান মোতায়েনের কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছেন ওবেইদ। তিনি তুরস্ককে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। মিশরও সীমিত ভূমিকায় যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা তার।অন্যদিকে, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি মনে করেন, সৌদি আরব মিত্রদের কাছ থেকে সহায়তা পেলেও তারা সরাসরি যুদ্ধের অংশ হতে আগ্রহী কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তার মতে, সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্র ও রসদসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হতে পারে। তবে তুরস্ক, পাকিস্তান, মিশর বা যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলায় যুক্ত হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৩১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যবস্থাকে ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে পরিচিত করে। ইস্তাম্বুলে বৈঠকের পর তিন দেশ রিয়াদে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম পর্যায়ে এর মহাসচিব হিসেবে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যৌথ প্রতিরক্ষা। তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে অন্য দুই দেশের ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।চুক্তির সময় ফিদান বলেছিলেন, পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করাই এই জোটের ভিত্তি। অন্য দেশগুলোর জন্যও জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ খোলা রাখা হয়েছে।
হুথিদের হামলার পর পাকিস্তানও সৌদি আরবের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, সৌদি আরবের পাশে ‘কূটনৈতিক ও শারীরিকভাবে’ থাকবে পাকিস্তান। ‘শারীরিকভাবে’ থাকার বিষয়টিতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে জানিয়েছে, হুথিদের হামলার পর মক্কা চুক্তির আওতায় সামরিক প্রতিক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তারপরও চুক্তির প্রতি নিজেদের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এর আগে বলেছিলেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা হলে চুক্তিটি কার্যকর হতে পারে। তবে কোন পরিস্থিতিতে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, শনিবার ভোরে হুথিরা রিয়াদ লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি ধ্বংস করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশা, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবুতে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়।ইয়েমেনের ভেতরেও লড়াই তীব্র হয়েছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর দাবি, দক্ষিণ মারিবের আল-ফুলিয়াহান এলাকায় হুথিদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। তাদের দাবি, এতে ১২ জন হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।মারিব ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল। লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা দখলের পর হুথিরা মারিবের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিদের সামরিক অগ্রগতি শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগরের সংযোগকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত থাকায় লোহিত সাগরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবেও লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে হুথিদের হামলা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সংবাদ, কলাম, তথ্য বা ছবি ব্যবহার করা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
Leave a Reply