
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হারদী ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে একটি বিলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের যুগান্তকারী ও বলিষ্ঠ মধ্যস্থতায় অবসান ঘটল দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের। দীর্ঘদিনের এই সামাজিক বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে গত শনিবার (২০ জুন) রাতে আলমডাঙ্গা থানায় উভয় পক্ষ এক ফলপ্রসূ সমঝোতায় উপনীত হয়। পুলিশের এই ঐতিহাসিক ও সফল উদ্যোগের পর পুরো কেশবপুর গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করেছে আনন্দিত গ্রামবাসী। এর ফলে দীর্ঘ ২৫ বছর পর এলাকাটিতে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশ ও স্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কেশবপুর গ্রামে মূলত একটি বিলের মালিকানা ও লিজ সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তারে ‘সালাম গ্রুপ’ এবং ‘মনসুর আলী চেঙ্গিস খান গ্রুপ’-এর মধ্যে গত ২৫ বছর ধরে চরম বিরোধ চলে আসছিল। এই দীর্ঘ দুই যুগের বিবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে অন্তত ২০ থেকে ২২টি মামলা বিজ্ঞ আদালত ও থানায় চলমান রয়েছে। এই বিরোধের জেরে অতীতে বহু হতাহত ও দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো গ্রামবাসীর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর এই উত্তেজনা আরও তীব্র রূপ ধারণ করে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে ও এলাকায় স্থায়ী শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের দিক-নির্দেশনায় বিরোধ সমাধানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় এই শান্তি প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান নিজে উদ্যোগী হয়ে উভয় পক্ষকে আলমডাঙ্গা থানায় ডেকে দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময় করেন। এ সময় আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রোকন ও সাবেক সভাপতি শহিদুল কাউনাইন টিলু উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আলমডাঙ্গার থানার ওসি বাণী ইসরাঈল বলেন,“কেশবপুর গ্রামের দীর্ঘদিনের এই সামাজিক দ্বন্দ্ব নিরসনে পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশনায় আমরা উভয় পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্যার এ বিষয়ে গ্রামবাসীর সাথে মতবিনিময় করেছেন এবং সেখানে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এখন থেকে সালাম ও চেঙ্গিস গ্রুপ নিজেরা বসে সব সমস্যা সমাধান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই শান্তি প্রক্রিয়া বজায় রাখতে জেলা পুলিশ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা উভয় পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম এবং আলোচনা দারুণ ফলপ্রসূ হয়েছে। বস্তুত, ২৫ বছর ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে আমাদের আরও আগে বসা উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন সম্পূর্ণ সমাপ্তির পথে।”
দীর্ঘ ২৫ বছর পর জেলা পুলিশের এমন ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মীমাংসায় চরম উচ্ছ্বাস দেখা গেছে সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে। তারা জানান, আগামী মঙ্গলবার চূড়ান্ত আপোষনামা স্বাক্ষরিত হবে। ইতিমধ্যেই দুই পক্ষের প্রধান—চেঙ্গিস এবং সালাম—গ্রামে এসে সবার সামনে ঘোষণা দিয়েছেন যে তারা নিজেরা বসে সব মীমাংসা করে নেবেন এবং কোনো গ্রামবাসী আর কোনো ঝামেলায় জড়াবেন না। সফল মীমাংসার পর গত শনিবার রাতেই থানার সামনে উপস্থিত শতাধিক গ্রামবাসী স্লোগানের মাধ্যমে জেলা পুলিশ, পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। পরবর্তীতে কেশবপুর গ্রামেও রাতে গ্রামবাসীরা স্বতস্ফূর্তভাবে মিষ্টি বিতরণ করেন। দীর্ঘ ২৫ বছর পর কেশবপুর গ্রামে এখন সম্প্রীতির সুবাতাস বইছে।
পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সংবাদ, কলাম, তথ্য বা ছবি ব্যবহার করা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
Leave a Reply