তীব্র তাপপ্রবাহ, জ্বালানি সংকট এবং ঘন ঘন লোডশেডিং এই তিন সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে চুয়াডাঙ্গার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গতকাল শুক্রবার জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রখর সূর্যতাপে শুধু মানুষই নয়, অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর পিচ গলে আলকাতরার মতো নরম হয়ে পড়েছে, যা এক বিরল কিন্তু ভয়াবহ বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গায় গরমের তীব্রতা নতুন নয়, তবে এবারের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধরণ অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ী। টানা কয়েকদিন ধরে ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করা তাপমাত্রা মানুষের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাইরে বের হওয়া একপ্রকার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে দেখা যাচ্ছে, পিচ গলে গাড়ির চাকার সঙ্গে লেপ্টে যাচ্ছে, ফলে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়েছে। পথচারীরা জানিয়েছেন, নিচ থেকে উঠে আসা তপ্ত বাষ্প ও ওপরের প্রখর রোদ মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা পর্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ছে। এই তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিকসহ খোলা আকাশের নিচে কাজ করা সব শ্রেণির মানুষ। জীবিকার তাগিদে তাদেরকে ঝুঁকি নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শহরের তেলের পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যেখানে মাথার ওপর তপ্ত সূর্য আর নিচে উত্তপ্ত পিচ দুইয়ের মধ্যে পড়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৪৬ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে দিনে-রাতে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় ১২ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে, ফলে গড়ে মানুষ মাত্র ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার এই চক্রে বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে ফ্যান বা শীতলীকরণ ব্যবস্থার অভাবে মানুষ চরম অস্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। চলতি বছরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া হাজারো শিক্ষার্থী এবং সামনে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছেন না। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়ার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে এবং মানসিক চাপ বাড়ছে। ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে—দিনের বেলায় গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে ক্রেতা কমে যাচ্ছে, আর সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধ রাখতে হওয়ায় আয় কমে যাচ্ছে।
গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও নাজুক। পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি হওয়ায় কৃষিকাজে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে। ইরি-বোরো ধান কাটার মৌসুমে সেচ সংকট দেখা দিয়েছে, কারণ বিদ্যুৎ না থাকায় সেচযন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। আবার ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে, যা কৃষকদের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবহাওয়া কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং বাতাসে আর্দ্রতা তুলনামূলক কম থাকায় গরমের তীব্রতা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। শরীর থেকে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ায় পানিশূন্যতা ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। চিকিৎসকরা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং বেশি করে পানি, ওরস্যালাইন ও তরল খাবার গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি কেবল একটি মৌসুমি ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রভাব। রাস্তার পিচ গলে যাওয়ার মতো ঘটনা পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার একটি সতর্ক সংকেত। দ্রুত বনায়ন, জলাশয় সংরক্ষণ এবং টেকসই নগর পরিকল্পনা না করলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে বসবাস আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে, তীব্র দাবদাহ, জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের ত্রিমুখী চাপে চুয়াডাঙ্গার মানুষ এখন চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। স্বস্তির বৃষ্টির আশায় প্রহর গুনছেন তারা, তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে—এই দুঃসহ পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে গ্যাস ও কয়লার ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ৩০ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে দুটি সংস্থা, শহর এলাকায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং গ্রামীণ এলাকায় মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় জেলায় গ্রাহক সংখ্যা ৫ লাখ ১৯ হাজার ৭৬৪। একটি ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড ও ১২টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে এসব গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র জানায়, চলতি মাসে তাদের চাহিদা ১৪২ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম। চলতি সপ্তাহে ১৪২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ওজোপাডিকোর অধীনে চুয়াডাঙ্গায় প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। এখানেও লোডশেডিং রয়েছে, তবে পল্লী বিদ্যুতের তুলনায় কিছুটা কম। ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা জোনাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, তাদের জোনে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৮৪ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৭৪ হাজার। চাহিদা ২০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৩ মেগাওয়াট, যার ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
Leave a Reply