আর মাত্র দু একদিন পরই পবিত্র ঈদুল ফিতর। চারদিকে নতুন জামাকাপড় আর আনন্দের প্রস্তুতি। কিন্তু সেই আনন্দের ছোঁয়া পাওয়ার আগেই মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মাইলমারী (ধলা) গ্রামের দুই পরিবারে নেমে এল ঘোর অমাবস্যা। বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে অকালেই নিভে গেল দুই শিশুর প্রাণের প্রদীপ। মঙ্গলবার দুপুরে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পুরো গ্রাম এখন স্তব্ধ। নিহত শিশুরা হলো মাইলমারী গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে আদিব হোসেন (৩) এবং তার খেলার সাথী প্রতিবেশী আকাশ আলীর ছেলে ইউসুফ আলী (৪)। দুই নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যুতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। তাই সকাল থেকেই বাড়ির মহিলারা ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং ধান ভাঙানোর কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিলেন। বাড়ির বড়দের এই ব্যস্ততার সুযোগেই সবার অগোচরে আদিব ও ইউসুফ বাড়ির উঠান থেকে পাশের পুকুরপাড়ে চলে যায়। দীর্ঘ সময় তাদের দেখতে না পেয়ে স্বজনদের মনে শঙ্কা জাগে। শুরু হয় চারদিকে খোঁজাখুঁজি। একপর্যায়ে পুকুরের শান্ত জলে ভেসে ওঠে দুই শিশুর নিথর দেহ। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের দ্রুত উদ্ধার করে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফারুক আহম্মেদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিষণ্ন মনে জানিয়ে দেন, হাসপাতালে আনার আগেই তারা না ফেরার দেশে চলে গেছে।
খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ হাসপাতাল ও নিহতের বাড়িতে ভিড় করেন। হাসপাতাল চত্বরে দুই শিশুর মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। আদিবের বাবা আব্বাস আলী ও ইউসুফের বাবা আকাশ আলীর আহাজারিতে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে ওঠে। ঈদের নতুন পোশাক পরার আগেই সাদা কাফনে মোড়ানো হলো এই দুই নিষ্পাপ শিশুকে। ঈদের আনন্দ আসার আগেই শোকার্ত পরিবারগুলোর ঘরে নেমে এসেছে এক অন্ধকার অমাবস্যা। প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীর মাঝেও বিরাজ করছে গভীর স্তব্ধতা।
গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার দাস জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। পরিবারের কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটি দাফনের জন্য স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
হয়তো কদিন বাদেই পাড়ায় পাড়ায় ঈদের আনন্দ বাজবে, কিন্তু মাইলমারী গ্রামের এই দুই বাড়িতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়। অসাবধানতাবশত ঘটে যাওয়া এই মৃত্যু যেন পুরো এলাকার মানুষের কাছে এক বড় আক্ষেপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিভে গেল দুটি প্রদীপ, রয়ে গেল শুধু স্বজনদের সারাজীবনের দীর্ঘশ্বাস।
Leave a Reply