চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় অপারেশন পরবর্তী জটিলতায় দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় বুধবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রশাসন ও চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগের একটি বিশেষ টিম ফাতেমা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ক্লিনিকটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কাগজপত্র ছাড়াই এক ব্যক্তিকে রক্ত দেওয়ার অভিযোগে ভোক্তা অধিকার আইনে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জানা যায়, চলতি মাসের ৭ ও ১৩ এপ্রিল আলমডাঙ্গা থানা রোডে অবস্থিত ওই ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লাবনী আক্তার ও পারুলা নামে দুই নারীর মৃত্যু হয়। অভিযানে অব্যবস্থাপনার দায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করার পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলমডাঙ্গার দুর্লভপুর গ্রামের মুস্তাক আহম্মেদের স্ত্রী চামেলি খাতুন গত ৭ এপ্রিল প্রসব বেদনা নিয়ে ফাতেমা হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি সন্তান জন্ম নিলেও পরবর্তীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, উপজেলার পারকুলা গ্রামের শাহিন আলীর স্ত্রী লাবনী খাতুনকে গত ১৪ এপ্রিল একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিজারিয়ান অপারেশনের পর জটিলতা দেখা দিলে তাকেও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। দুই পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ না থাকলেও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চুয়াডাঙ্গার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. আওলিয়ার রহমান ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাকিল আহম্মেদ শফিউল্লাহ’র নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হাসপাতালের ওটি ও অন্যান্য সেবাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং রোগীদের নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করেন। অভিযানকালে হাসপাতালের সেবায় কিছু অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে ভোক্তা অধিকার আইনে এক রোগীকে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত দেয়ার ঘটনায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক প্রসূতির ক্ষেত্রে পূর্বে কুষ্টিয়ার আদ দ্বীন প্রতিষ্ঠানে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়েছিল এবং সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে অপারেশন সম্পন্ন করা হয়। বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। তাদের অভিযোগ নিজেরা অপারেশনের আগে কেন আল্ট্রা সনোগ্রাম করানো হয়নি। অন্যদিকে, অপারেশনের আগে নিজস্ব আল্ট্রাসনোগ্রাম না করার বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করে, রোগীদের পক্ষ থেকেই অসহযোগিতা ছিল। এমনকি এক প্রসূতির ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের পাশাপাশি পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগও তোলে তারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, অপারেশনের আগে প্রসূতির পেটে তার স্বামী লাথি মেরেছিলেন, যা অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। মূলত রোগীর শারীরিক জটিলতা ও স্বজনদের অনুরোধেই অপারেশন করা হয়েছিলো। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. আওলিয়ার রহমান জানান, ‘পরপর দুটি মৃত্যুর ঘটনা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী হাসপাতালের লাইসেন্স বা কার্যক্রমের বিষয়ে পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ পরপর দুটি মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের দাবি, ক্লিনিকগুলোর সেবার মান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
Leave a Reply