দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে হবে? এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ঢাকা মেইলকে বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। এ নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। পদটি শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের বিষয়ে সংবিধানে যা বলা আছে—
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ নিয়ে সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ হতে পাঁচ বছরের মেয়াদে তার পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। তবে শর্ত থাকে, রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হলেও তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন।
(২) একাদিক্রমে হোক বা না হোক, দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোনো ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না।
(৩) স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদত্যাগ করতে পারবেন।
(৪) রাষ্ট্রপতি তার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতিরূপে তার কার্যভার গ্রহণের দিন সংসদে তার আসন শূন্য হবে।
রাষ্ট্রপতির অভিশংসন
অভিশংসন নিয়ে সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—
(১) এই সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যাবে। এ জন্য সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে অভিযোগের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে দিতে হবে। স্পিকারের কাছে নোটিশ দেওয়ার দিন থেকে ১৪ দিনের আগে বা ৩০ দিনের পরে এ প্রস্তাব আলোচনা করা যাবে না। সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে স্পিকার অবিলম্বে সংসদ আহ্বান করবেন।
(২) এ অনুচ্ছেদের অধীন কোনো অভিযোগ তদন্তের জন্য সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত বা আখ্যায়িত কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের কাছে সংসদ রাষ্ট্রপতির আচরণ তদন্তের জন্য পাঠাতে পারবে।
(৩) অভিযোগ বিবেচনার সময় রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকা এবং প্রতিনিধি প্রেরণের অধিকার থাকবে।
(৪) অভিযোগ বিবেচনার পর সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ যথার্থ বলে ঘোষণা করে কোনো প্রস্তাব গৃহীত হলে, প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
৫) সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে এ অনুচ্ছেদের বিধানাবলি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাপেক্ষে প্রযোজ্য হবে।
অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির অপসারণ
সংবিধানের ৫৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— (১) শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতিকে তার পদ থেকে অপসারণ করা যাবে। এ জন্য সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে অসামর্থ্যের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে দিতে হবে।
(২) সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে নোটিশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পিকার সংসদের অধিবেশন আহ্বান করবেন এবং একটি চিকিৎসা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব আহ্বান করবেন। প্রয়োজনীয় প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর স্পিকার রাষ্ট্রপতির কাছে নোটিশের একটি অনুলিপি পাঠিয়ে ১০ দিনের মধ্যে চিকিৎসা পর্ষদের কাছে পরীক্ষার জন্য উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানাবেন।
(৩) অপসারণের প্রস্তাবের নোটিশ দেওয়ার ১৪ দিনের আগে বা ৩০ দিনের পরে প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে না।
(৪) প্রস্তাব বিবেচনার সময় রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকা এবং প্রতিনিধি প্রেরণের অধিকার থাকবে।
(৫) রাষ্ট্রপতি চিকিৎসা পর্ষদের কাছে পরীক্ষার জন্য উপস্থিত না হলে সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
(৬) রাষ্ট্রপতি চিকিৎসা পর্ষদের কাছে পরীক্ষার জন্য উপস্থিত হলে পর্ষদের মতামত সংসদে উপস্থাপনের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে না।
(৭) সংসদ কর্তৃক প্রস্তাব ও চিকিৎসা পর্ষদের প্রতিবেদন বিবেচনার পর মোট সদস্যসংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হলে, গৃহীত হওয়ার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
অনুপস্থিতি প্রভৃতির কালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, ক্ষেত্রমতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন।
৪৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি—৩৫ বছরের কম বয়সী হন; সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন; অথবা
সংবিধানের অধীন অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন।
নির্বাচন পদ্ধতি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে এ নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এজন্য জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নির্বাচনি কর্তা সভাপতিত্ব করবেন।
সংসদের অধিবেশন চলাকালে নির্বাচনের প্রয়োজন হলে কমিশন ভোটগ্রহণের অন্তত সাত দিন আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের সময়সূচি নির্ধারণ করবে। আর সংসদের অধিবেশন না থাকলে ভোটগ্রহণের অন্তত সাত দিন আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংসদের বৈঠক আহ্বান করা হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও একজন সংসদ সদস্যের সমর্থকের স্বাক্ষর থাকতে হবে। পাশাপাশি মনোনীত ব্যক্তির সম্মতিসূচক একটি বিবৃতিও সংযুক্ত করতে হবে। এ নির্বাচনে ভোটার হবেন সংসদ সদস্যরা। কমিশন একটি ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে।
বৈধ একাধিক প্রার্থী থাকলে এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পরও একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদের বৈঠকে নির্ধারিত দিনে দুপুর ১২টার পর ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনা—উভয়ই প্রকাশ্যে হবে। সর্বোচ্চ ভোট একাধিক প্রার্থী পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করবেন নির্বাচন কমিশনার। ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
পদ শূন্য হলে নির্বাচনের সময়
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে নির্বাচন করতে হলে মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে তিনি যে সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই সংসদের মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।
তবে মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে, পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া আলোচনাকে গুঞ্জন বলে মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। সেটি যদি বাস্তবে ঘটে, তখন আমরাও দেখব। রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত কিংবা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব ছাড়তে চান, তাহলে সাংবিধানিকভাবে সে সুযোগ রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু বলা হচ্ছে না। তিনি (রাষ্ট্রপতি) স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন কি না, সেটি তাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এরপর ওই বছরের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। সংবিধান অনুযায়ী, তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। পরবর্তী সময়ে সংসদ বিলুপ্তি, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াগুলোতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবি তুলেছিলেন আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা। তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সাংবিধানিক শূন্যতার আশঙ্কায় সে সময় বিএনপি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ চায়নি বলেও আলোচনা রয়েছে।
তবে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পদত্যাগ করতে চান। সে সময় তিনি আরও বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন।
এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, অন্যথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন।
ডিজিটাল বাংলার প্রতিচ্ছবি
Copyright © 2026 OnlineTV. All rights reserved.