মেহেরপুরে অনলাইন জুয়া ও অবৈধ ডিজিটাল লেনদেনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত অপরাধ নেটওয়ার্কে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। মধ্যরাতে নাটকীয় অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন এই চক্রের আলোচিত মুখ জামান উদ্দিন ওরফে জামান মাস্টার। আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইনে দায়ের করা মামলায় বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তাকে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে বিচারক কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, ২৫ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে জেলা ডিবি পুলিশ ও কোমরপুর পুলিশ ক্যাম্পের যৌথ দল জামান মাস্টারের বাড়ি ঘিরে ফেলে। রাত ১টা ১০ মিনিট থেকে একাধিকবার গেট খুলে দিতে বলা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালীর নাম উল্লেখ করে পুলিশকে অভিযান বন্ধের চাপ দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শেষ পর্যন্ত পুলিশ প্রাচীর টপকে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে এবং জামান মাস্টারকে আটক করে। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে কোনো মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ উদ্ধার করা যায়নি। পুলিশ ধারণা করছে, অভিযানের আগেই গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ডিভাইস সরিয়ে ফেলা হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জামান মাস্টার কোনো বক্তব্য দেননি। পরে তাকে মুজিবনগর থানায় রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা সাইবার সুরক্ষা আইনের দ্বিতীয় মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে। তদন্তে অনলাইন জুয়ার অর্থের উৎস, হুন্ডি ও ডিজিটাল লেনদেনের পথ, এবং চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় পলাতক আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।’ মাত্র দুই দিন আগে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘অনলাইন ক্যাসিনো ও জুয়া এজেন্টদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।’
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর উত্থানের গল্প। একসময় ঢাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি করা জামান মাস্টার গ্রামে ফিরে মুজিবনগর আদর্শ মহিলা কলেজ নামের একটি নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী কাম হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে কোমরপুর বাজারে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং পয়েন্ট চালু করার পর থেকেই তার আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হয়।
জানা গেছে, তিনি আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্ম খরহবনবঃ, ১ীইবঃ এবং গবষনবঃ–এর আঞ্চলিক এজেন্ট হিসেবে মাঠপর্যায়ে অর্থ সংগ্রহ ও লেনদেন পরিচালনা করতেন। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে কাঁচা ঘর থেকে দোতলা বিলাসবহুল বাড়ি, জমি, দামি গাড়ি ও একাধিক মোটরসাইকেলের মালিক বনে যান তিনি। যার কোনো বৈধ আয়ের উৎস পুলিশ এখনো শনাক্ত করতে পারেনি।
মেহেরপুরকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বিস্তৃত এই অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্কের অন্যতম সংগঠক হিসেবে জামান মাস্টারের নাম উঠে এসেছে। শুরু থেকেই তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে নুরুল ইসলাম ওরফে লালন মাস্টারের নাম সামনে আসে, যিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রভাব ও ছত্রচ্ছায়ার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অনলাইন জুয়ার সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। চক্রের অন্যান্য সদস্য, অর্থের প্রকৃত উৎস এবং সম্ভাব্য পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্তে নতুন করে অনুসন্ধান জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
Leave a Reply