একুশের দুপুর। ভাষা শহীদদের স্মৃতিতে ভেজা দিন। সেই দিনে আলমডাঙ্গার শহীদ মিনার চত্বর হয়ে উঠল বই, মানুষ আর চেতনার মিলনস্থল। জাকজমকপূর্ণ আয়োজনে আলমডাঙ্গায় শুরু হলো তিন দিনব্যাপী অমর একুশে বইমেলা। গতকাল শনিবার দুপুরে প্রধান অতিথি হিসেবে বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. মাসুদ পারভেজ রাসেল। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, দএকুশ মানে মাথা নত না করার শিক্ষা, ভাষার মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার জায়গা নয় এটি আমাদের চেতনা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মিলনমেলা। তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করতে এমন আয়োজন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে আলোকিত করে, জাতিকে এগিয়ে নেয়।’ তিনি আরও বলেন, দডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আমাদের জ্ঞানচর্চা সহজ করেছে, কিন্তু বইয়ের গভীরতা ও অনুভূতির কোনো বিকল্প নেই। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।’ আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটির আয়োজনে ও আলমডাঙ্গা পৌরসভার সহযোগিতায় আয়োজিত এই বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার পান্না আক্তার। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, দমহান একুশ আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। ভাষা শহীদদের ত্যাগের কারণেই আমরা আজ স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলতে পারছি। বইমেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে।’ তিনি আরও বলেন, দশিশু-কিশোরদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাষা ও সংস্কৃতি বিকাশে সব ধরনের ইতিবাচক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।’ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএসএম শাহনেওয়াজ মেহেদী, আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ বাণী ইসরাঈল, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এসএম মাহমুদুল হক, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জিয়াউল হক, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আলা উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সভাপতি সাবেক ব্যাংকার সিরাজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন, সহসভাপতি ও আলমডাঙ্গা ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি সাংবাদিক রহমান মুকুল, সাবেক চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান, সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুর ইসলাম পিন্টু, প্রভাষক ইদ্রিস খান, বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আব্দুল্লাহ আল মামুন। হারদী এমএস জোহা কলেজের সহকারী অধ্যাপক একেএম ফারুক হোসেনের সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারেছ উদ্দিন, জেলা জামায়াতের যুব বিষয়ক সম্পাদক শেখ নূর মোহাম্মদ হুসাইন টিপু, আইন ও আদালত বিষয়ক সম্পাদক দারুস সালাম, উপজেলা আমীর প্রভাষক শফিউল আলম বকুল, পৌর আমীর মাহের আলী, উপজেলা সেক্রেটারি মামুন রেজা ও পৌর সেক্রেটারি মুসলিম উদ্দিন, সাংবাদিক শাহ আলম মন্টু, হামিদুল ইসলাম আজম, শরিফুল ইসলাম রোকন, নাজমুল হক শাওন, সাহিত্যিক পিন্টু রহমান, সাহিত্যিক মোস্তাফিজুর রহমান ফরায়েজী কবি গোলাম রহমান চৌধুরী। উউদ্বোধনী দিনে শিশুকিশোর শিক্ষার্থীদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন ছিল। প্রতিযোগিতায় শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। মফস্বলে বইমেলা একটি সাহসী দৃষ্টান্ত আলমডাঙ্গার মতো মফস্বল এলাকায় ধারাবাহিক বইমেলা—ভাবতেই ভালো লাগে। এতদিন বইমেলা মানেই বড় শহর—এই ধারণা ভেঙে দিয়েছে আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটি। এ বছর স্বল্প প্রচার-প্রচারণার মধ্যেও তিন দিনব্যাপী বইমেলায় ২১টি স্টলে প্রকাশনা সংস্থা ও স্থানীয় লেখকদের বই স্থান পেয়েছে। উদ্বোধনের দিন থেকেই বইপিপাসু নারী-পুরুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বই মানুষকে আলোকিত করে। জ্ঞান দেয়, ভাবতে শেখায়, মনুষ্যত্ব জাগায়। বই পড়লে মানুষ বড় হয় মননে, চিন্তায়, দৃষ্টিতে। নতুন পাঠক তৈরি করতে, লেখক-পাঠকের সরাসরি যোগাযোগ গড়তে বইমেলার বিকল্প নেই। ভাষার মাসে এই বইমেলা আলমডাঙ্গার স্থায়ী ঐতিহ্যে রূপ নেবে—এমন প্রত্যাশাই এখন আলমডাঙ্গাবাসীর।
Leave a Reply