1. online@cnbtvbd.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@cnbtvbd.com : admin :
রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:২২ পূর্বাহ্ন

বিদেশে যেতে বাংলাদেশিদের ‘ভিসা সংকট’ কাটছে না কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৮৯ বার পঠিত

‘সব ধরনের কাগজপত্র যাচাই করেই ভিসার জন্য জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু আমার আবেদন রিজেক্ট (বাতিল করা) হয়েছে। কেন এমন হলো এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাও আমি পাইনি।’

এভাবেই বলছিলেন শিক্ষার্থী ভিসায় অষ্ট্রেলিয়া যেতে ইচ্ছুক ঝিনাইদহের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম। দেশটির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও শেষমেষ ভিসা জটিলতায় যেতে পারেননি তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ ভিসার জন্য অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছেন ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাইমিনুল খান ও তার পরিবার।

মোহাইমিনুল খান বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভিসা নিয়ে জটিলতা বেড়েছে। দেশটির নতুন ভিসা বন্ড তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মী ভিসায় যেতে ইচ্ছুক এমন আরো কয়েকজন এবং ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজে যুক্তদের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশিদের ভিসা না হওয়ার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। প্রথমত, ভিসা আবেদনের সময় সঠিক নথি জমা না দিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের ব্যবহার হচ্ছে ব্যাপকভাবে। অনেকেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার সনদ, প্রশিক্ষণ সনদ এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টের ভুয়া কাগজ জমা দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ভ্রমণ ভিসায় কোনো দেশে গিয়ে থেকে যাওয়া, কিংবা একদেশে গিয়ে অন্য দেশে অবৈধভাবে চলে যাওয়ার প্রবণতাও অনেক। এর ফলে একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের ক্ষতি করছেন, তেমনি পরবর্তীতে সৎ উপায়ে যেতে চাওয়া অন্যদেরও ভিসা না পাওয়ার কারণ হচ্ছেন তিনি।

তৃতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সুশাসন প্রেক্ষাপট। এমনিতেই নানা কারণে বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা নিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন ব্যক্তিকে ভিসা দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেয় অন্য দেশ। পাশাপাশি দুই দেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের ভিসা পাওয়ার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

একদিকে অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো ভিসা দেওয়ার হার যেমন কমিয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশের শ্রমবাজারও বাংলাদেশিদের জন্য কার্যত বন্ধ।

অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরে জনশক্তি ও শিক্ষার্থী ভিসায় কিছু মানুষ যেতে পারলেও সংখ্যা খুবই নগণ্য।

থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, এবং সিঙ্গাপুরের ভিসা কিছুটা নাগালের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর ভবিষ্যত নির্ভর করছে।

এছাড়া দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে পার্শবর্তী দেশ ভারতও।

এমন পরিস্থিতিতে মেয়াদউত্তির্ণ নথি কিংবা অবৈধভাবে থেকে যাওয়া বাংলাদেশিদের ডিপোর্ট করা বা ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও বেড়েছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে গড়ে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশিকে নানা কারণে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

ভিসা নিয়ে কেন সংকট?

অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন দেশের ভিসা পেতে জটিলতায় পড়ছেন বাংলাদেশের নাগরিকরা। শ্রমবাজারের পরিস্থিতিও খুব একটা স্বস্তির নয়।

বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে ‘অ্যান্টি ইমিগ্র্যান্ট’ সেন্টিমেন্ট বা অভিবাসনবিরোধী মানসিকতা বাড়তে থাকায় অনেক দেশই একদিকে যেমন বৈধভাবে মানুষ নিচ্ছে না আবার অনেককে ফেরতও পাঠাচ্ছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে গত আট বছরে অন্তত চার হাজার বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকেও গত এক বছরে অন্তত তিনশ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়।

শ্রমশক্তি রফতানির ক্ষেত্রেও সংকটে বাংলাদেশ। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল সৌদি আরবে কিছু মানুষ যেতে পারছেন।

এছাড়া বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়াসহ সহ অনেক দেশই বাংলাদেশ থেকে শ্রমশক্তি আমদানি বন্ধ রেখেছে।

ফখরুল ইসলাম বলছেন, জাপান এবং সিঙ্গাপুরে অল্প সংখ্যক দক্ষ জনশক্তি গেলেও বাকি কোনো দেশেই আর সুযোগ নেই এই মুহূর্তে।

শিক্ষার্থী কিংবা পর্যটন ভিসার ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। এই খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো দেশে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া, ভুয়া সার্টিফিকেট, তথ্য জালিয়াতিসহ নানা কারণে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেক বেশি জটিল করেছে বিভিন্ন দেশ। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ইরাম খান বলছেন, পর্যটনের জন্য নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি বর্তমানে চীনে কিছু মানুষ যাচ্ছেন।

এছাড়া থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে ভিসার প্রক্রিয়া এখনো নাগালের মধ্যে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক না হলে শিগগিরই এই দেশগুলোও বাংলাদেশের জন্য ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া কঠিন করতে পারে বলেই মনে করেন তিনি।

ইরাম খান বলেন, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ার আশা করছি আমরা।

আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের পাসপোর্টকে তেমন গুরুত্বের জায়গায় রাখছে না। এক্ষেত্রে নানা কারণে একটি অনাস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন এন্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম এর সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলছেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অনেক নাগরিককে ফেরত পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে গিয়ে আবেদন করা আশ্রয়ের আবেদনও সম্প্রতি অনেক বেশি বাতিল হচ্ছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশ যেতে চায় তাদের অন্তত ৮০ শতাংশই দালাল বা মধ্যসত্বভোগী নির্ভর।

তিনি বলেন, দালাল বা মধ্যসত্ত্বভোগীরা যে ধরনের কাগজ তৈরি করে দেয় বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ তার ওপরই নির্ভর করে।

এসব কারণেই বিভিন্ন দেশের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতায় পড়েন বাংলাদেশিরা।

তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা না পাওয়া বা বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশিদের নেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ কম থাকার একটি বড় কারণ বলেও মনে করেন শরিফুল হাসান।

রাষ্ট্র নাকি ব্যক্তি, দায় কার

ভিসা পাওয়ার জন্য ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জাল অভিজ্ঞতা সনদ বা শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জমা দেওয়া, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন ও অবৈধ অবস্থান এমন নানা বিষয় একটি দেশের নাগরিককে ভিসা না দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের বেলায় এখানেই নেতিবাচক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশিদের ভিসা না দেওয়ার কারণ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরীণ ‘সিস্টেমকে’ দায়ী করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা।

তিনি বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলছেন, এটা দেশের দায়। আমাদের পুরো সিস্টেমের দায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও না, আমার ব্যক্তিগতভাবেও না। কারণ, পৃথিবীজুড়ে প্রচুর সুযোগ আছে। আমরা সেটা ব্যবহার করতে পারছি না নিজেদের দোষে।

পাসপোর্ট, ভিসার ক্ষেত্রে জালিয়াতির প্রসঙ্গ অতীতে সামনে এনেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা নিজেও।

বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র কিংবা ভিসা পেতে জালিয়াতির ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। এর ফলে বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের সম্মানহানী নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে অতীতের সরকারগুলোকেও।

কিন্তু এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে কার্যকর পদক্ষেপ কখনই নেওয়া হয়নি বলেই মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেমন ব্যক্তি দায়ও রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায়ও গলদ রয়েছে।

তিনি বলছেন, কেউ ভুল তথ্য দিচ্ছেন, আবার অনেকে ওই দেশে গিয়ে এমন কিছু করছেন যাতে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। ফলে পরবর্তীতে তারাও বাংলাদেশের কাউকে ভিসা দিতে দুইবার ভাবছে।

এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশিলতা এবং সরকারের ওপর আস্থা না থাকাকেও দায়ী করছেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।

তিনি বলেন, আগে থেকেই অনেক সমস্যা রয়েছে, সেই সাথে বর্তমান সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সবকিছু।

ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশি পাসপোর্টের ‘রিস্ক প্রোফাইল’ বাড়িয়ে দিয়েছে বলেই মনে করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন এন্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম এর সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান। অনেক সময় সাধারণ মানুষকে বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুয়া কাগজপত্র পাঠানো হয়। বিমানবন্দরে গিয়ে যখন এসব ধরা পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশ একটি ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

শরিফুল হাসান বলছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক’ এবং বায়োমেট্রিক যাচাই কঠোর করেছে।

বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান, স্বাস্থ্য সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সুশাসন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন শরিফুল হাসান।

তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সুশাসনের দিকে বাংলাদেশ যেতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত দেশের নাগরিকদের বাইরে যাওয়ার জায়গাও কমবে।

তিনি বলেন, নীতি নির্ধারকরা মুখে এসব কথা বললেও তারা যে এটা খুব একটা ঠিক করতে চায় বিষয়টা তেমন নয়। তাহলে তাদের সন্তানকে দেশের বাইরে পড়তে পাঠাতো না, নিজেরা চিকিৎসা নিতে অন্য দেশে যেত না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
All rights reserved © 2026
Design By Raytahost