আসন বণ্টন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে টানাপোড়নের মধ্যেই চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন জানিয়েছে, এখনও জোট আছে। পারস্পরিক আলোচনা চলছে। দ্রুত ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার নীতির রূপরেখা ও ধরন পরিষ্কার হবে।
বুধবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। একই অবস্থান জানিয়েছেন, মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারা। দল দুটির সঙ্গে আসন বণ্টন চূড়ান্ত না হওয়ায় জামায়াত বুধবার বিকেলে ১১ দলের প্রার্থী ঘোষণার সংবাদ সম্মেলন ডেকেও তা স্থগিত করে।
আসন নিয়ে এই দল দুটির সঙ্গে জামায়াতের টানাপোড়েন চলছে। জামায়াত ১১ দলের শরিক ইসলামী আন্দোলনকে ৪৫ আসন ছাড়তে রাজি রয়েছে। ৫টি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এগুলোতে দাঁড়িপাল্লা এবং হাতপাখা উভয় প্রতীকের প্রার্থী থাকবে। তবে একসময়ে ১৫০ আসন চাওয়া ইসলামী আন্দোলন এখন কমপক্ষে ৬৫ আসন চায়।
মামুনুল হকের খেলাফতকে ১৬টি আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত। এই দলকেও কয়েকটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করেছে। তবে ২৫ আসনের কমে রাজি হচ্ছেন না মামুনুল হক। তিনি জোটে থাকলে, ইসলামী আন্দোলনকে নিয়েই থাকতে চান।
এনসিপিকে ৩০, খেলাফত মজলিস এবং এলডিপিকে ৫টি করে, এবি পার্টিকে ৩টি, বিডিপি, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত আন্দোলনকে ৪-৫ আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত। আর বাকি ১৯০ আসনে নির্বাচন করতে চায় দলটি। তবে এবি এবং খেলাফতও আরও কয়েকটি আসন চাইছে।
১১ দলের সমঝোতায় টানাপোড়েন
দুই দলের বৈরিতার কয়েক দশকের ইতিহাস থাকলেও গত বছরের জানুয়ারিতে বরিশালে চরমোনাই পীরের সঙ্গে সাক্ষাত করেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। পরের সপ্তাহে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাক্ষাত করে ইসলামী আন্দোলনের আমিরের সঙ্গে ১০ দফায় সই করেন।
ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করে, গত মে মাসে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত, মাওলানা বাছিত আযাদের খেলাফত মজলিস, নেজামী ইসলাম, খেলাফত আন্দোলন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম মোর্চা গঠনের আলোচনা শুরু করে। পরে জমিয়ত চলে যায় বিএনপির জোটে।
ইসলামী আন্দোলসহ বাকি পাঁচ দলের সঙ্গে পরবর্তীতে যুক্ত হয় জামায়াত। যোগ দেয় জাগপা ও বিডিপি। এই আট দল গত বছরের জুলাই থেকে সংস্কারের পক্ষে অভিন্ন অবস্থান নেয় এবং সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলন করে।
এদিকে এনসিপি, গণ-অধিকার পরিষদ এবং এবি পার্টি তখন আলোচনায় যোগ দিলেও, আন্দোলনে রাজি ছিল না। পরবর্তীতে গণ-অধিকার যায় বিএনপির জোটে। আর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়ে এনসিপি, এবি পার্টি আসে জামায়াতের সঙ্গে। বিএনপির জোট ছেড়ে আসে এলডিপি। এতে জামায়াতের নির্বাচনী সমঝোতায় দলের সংখ্যা হয় ১১।
চরমোনাইয়ের টানা বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়নি
গত মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মজলিসের শুরার বৈঠক চলে রাজধানীর একটি মাদ্রাসায়। জামায়াত ৪৫টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি না হওয়ায় করনীয় কি- এ প্রশ্নে শুরার সদস্যদের কাছে মতামত চান চরমোনাই পীর তথা ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।
২৬৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। মজলিসের শুরার অধিকাংশ সদস্য মতামত দেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রার্থীরা মাঠে কাজ করছেন, তারা নির্বাচন করতে না পারলে ক্ষুব্ধ হবেন। তাই অন্তত ৭০ আসনে নির্বাচন করতে হবে।
শুরার কিছু সদস্য মতামত দেন, জামায়াতের ছেড়ে দেওয়া ৪০-৪৫ আসন নয়, এককভাবে নির্বাচন করা উচিত। জামায়াত নবগঠিত এনসিপিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চরমোনাই পীরকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জোটে থাকা উচিত নয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা সমকালকে এ কথা জানান।
এ পরিস্থিতিতে দলীয় আমির শুরা সদস্যদের জানিয়ে দেন, আসন সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত জামায়াতের ডাকা সংবাদ সম্মেলনে যাবেন না। জোটে থাকা, না থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ মজলিসে আমেলার বৈঠকে।
তবে বুধবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈঠক সূত্র জানায়, ছয় মাস ধরে এক সঙ্গে আন্দোলন এবং ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে, নির্বাচনের প্রাক্কালে জোট ছেড়ে এককভাবে বেরিয়ে যাওয়া উচিত হবে না বলে মতামত আসে।
মামুনুল হকও অনড়, সংবাদ সম্মেলন স্থগিত
বুধবার বিকেলে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের সংবাদ সম্মেলনে জোটের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের মতো মামুনুল হকের দলও, প্রত্যাশিত আসন চূড়ান্ত হওয়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এ পরিস্থিতিতে জামায়াত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করে। যদিও ১১ দলের সমন্বয়ক এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, কয়েকটি আসন নিয়ে যে মতভিন্নতা রয়েছে, তা দূর করতে আলাপ আলোচনার জন্য সময় নেওয়া হয়েছে। শিগগির সংবাদ সম্মেলন হবে।
জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, চরমোনাই পীরের অনুপস্থিতিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হলে জোটের ভাঙন নিশ্চিত ছিল। কিন্তু মামুনুল হকও অস্বীকৃতি জানানোর কারণে শেষ পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।
আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ। এর আগ পর্যন্ত জোট করার সুযোগ রয়েছে দলগুলোর। আসন নিয়ে অসন্তুষ্টি থাকলেও বুধবার বাংলাদেশ খেলাফতের বৈঠকেও জোট অটুট রাখতে সিদ্ধান্ত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দলটির যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে আসন বণ্টনের সুরাহা হবে বলে আমরা আশাবাদী। তাই সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।
আতাউর রহমানের বরাতে ইসলামী আন্দোলনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে চরমোনাই পীর ইসলামপন্থিদের ‘এক বাক্স’ নীতি ঘোষণা করেন। সেই নীতিতে ইসলামী আন্দোলন এখনও অটল থেকে কাজ করে যাচ্ছে।
সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের সভাপতিত্বে বৈঠকে ছিলেন দলের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, প্রেসিডিয়াম সদস্য মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ, যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, আশরাফুল আলম, শেখ ফজলে বারী মাসউদ, সহকারী মহাসচিব কে এম আতিকুর রহমান, মাওলানা আহমদ আব্দুল কাইয়ুম।
Leave a Reply