ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘পাতানো’ হবে বলে মনে করলেও ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা বলছেন জি এম কাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
তিনি বলেছেন, “আইনশৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি, আর সরকারের লোকজনের হুমকি ধামকির মধ্যে কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। সরকার রাতের ভোট অথবা দিনের ভোট অথবা ভোটের পরে ভোট অথবা মিডিয়া ক্যু অথবা মিডিয়া ভোট করতে পারে।”
বুধবার সন্ধ্যায় কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছিলেন মহাসচিব শামীম পাটোয়ারী।
তিনি বলেন, “একটা ক্রান্তিকালে এবং একটা টার্নিং পয়েন্টে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। দেশের বর্তমানে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। আমরা যতগুলো ভোট দেখেছি, ১২টি ভোটের মধ্যে ৯টিতে জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ করেছে।
“কোনো ভোটের দু-মাস আগে এত খারাপ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল বলে আমার মনে হয় না। ভোটের আগে রাজনৈতিক সমঝোতা করতে হয়। ভোটের আগে উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে হয়, নরমালাইজেশন প্রসেস করতে হয়, ভোটের আগে প্যাসিফিকেশন করতে হয়। আমরা দেখেছি উত্তেজনার পারদ বাড়ছে এবং সে পারদটি কমানোর জন্য সরকার নির্বাচন কমিশন বা অন্যান্য স্টেকহোল্ডার যথাযথ ভূমিকা নিচ্ছে না।”
সদ্য সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের কথা তুলে ধরে শামীম পাটোয়ারী বলেন, “তিনি বলেছেন লাশের বদলে লাশ পড়বে। আগে বলেছিলেন, প্রশাসন যখন সাজিয়েছিলেন, তখন সেখানে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি তাদের ইচ্ছামত লোক দিয়ে প্রশাসন সাজিয়েছে।
“আমরা আশঙ্কা করছি, একটি পাতানো নির্বাচন হতে পারে, একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ইলেকশন হতে পারে।… কোনো আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।”
আওয়ামী লীগ আমলে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি ছিল প্রধান বিরোধী দল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সমঝোতা এবং সংসদে ভূমিকার জন্য এইচ এম এরশদ প্রতিষ্ঠিত এ দল ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ তকমা পায়।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে জাতীয় পার্টিকে তার খেসারত দিতে হচ্ছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ বা নির্বাচন কমিশনের সংলাপে দলটিকে ডাকা হয়নি। রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাতে গিয়ে তারা বাধার মুখে পড়েছে। এমনকি ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়েছে।
সেরকম কোনো নিষেধাজ্ঞা না আসায় কাগজে কলমে জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ খোলা থাকলেও আদৌ প্রার্থীরা প্রচার চালাতে পারবেন কি না, সেই শঙ্কায় আছে দলটি।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সভায় সকলের মতামতের ভিত্তিতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে মহাসচিব বলেন, “তবে আমরা মনে করি প্রতিনিয়ত পথ পরিবর্তন হতে পারে। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী প্রশাসনকে সুষ্ঠু ভোটের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আহ্বান জানাচ্ছি যেন সকলে মিলে একটি ভোটের পরিবেশ করে। আহ্বান জানাচ্ছি সকলে মিলে যেন একটা সমঝোতা করে, সকলে মিলে যেন একটা ঐকমত্য সৃষ্টি করে।” ভোট সুষ্ঠু না হলে দেশে ‘গৃহযুদ্ধ’ হবে মন্তব্য করে শামীম পাটোয়ারী বলেন, “যে ঐকমত্য ছাড়া দেশের স্বাধীনতা, দেশের সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ আইন শৃঙ্খলা হুমকির মুখে পড়বে। একটা গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা আমরা করছি সামনের ভোটটি যদি সুষ্ঠ না হয়, গ্রহণযোগ্য না হয়, ক্রেডিবল না হয়, রিফ্লেক্টিভ না হয়, তাহলে দেশে ভবিষ্যতে গৃহযুদ্ধ হবে।
“তফসিল পিরিয়ডের পরে প্রশাসন চলে যাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে। অথচ আমরা দেখলাম তফসিল দেওয়ার পরে ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়েছে। আমরা দেখলাম ১৬ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটা কুচক্রী মহল আমাদের নওগাঁর অফিস ভাঙচুর করেছে। পুলিশ প্রশাসন সেখানে কোনো সহযোগিতা করতে পারেনি। তার মানে পুলিশ প্রশাসন এখনো নিজেকে নিরপেক্ষ ভাবতে পারছে না। পুলিশ প্রশাসন এখনো নিজেদের জঙ্গিদের উপরে ভাবতে পারছে না। তাই যদি হয়ে থাকে, সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা একটু একটু করে স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।”
জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলেন, তাদের দল ‘গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর’ পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো নেবে।
“প্রশাসনকে শক্তিশালী না করতে পারলে একটি ভজঘট নির্বাচন হতে পারে, একটি দুর্বল ম্যান্ডেটের নির্বাচন হতে পারে এবং রাজনৈতিক সমাধান না হয়ে ভবিষ্যৎ নির্বাচন রাজনৈতিক সংকটের কারণ হতে পারে।
“আহ্বান জানাব, ভবিষ্যৎ নির্বাচন যেন রাজনৈতিক সংকটের দিকে দেশকে নিয়ে না যায়, যেন রাজনৈতিক সংকট সমাধানের দিকে নিয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় পার্টি বুধবার থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করবে এবং নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করবে যেন পজিটিভলি তারা রাজনীতি করে। জাতীয় পার্টি পজিটিভ রাজনীতি করেছে।”
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সামনেও ‘জুতার মালা’ পড়বে কি না–সেই প্রশ্ন রেখে শামীম পাটোয়ারী বলেন, “ইতিহাস কখনোই নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকে পক্ষপাতিত্বের দায় থেকে অব্যাহতি দেবে না। এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা, প্রচেষ্টাই নির্ধারণ করবে–ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনারদের গলায় ফুলের মালা পড়বে, নাকি জুতার মালা পড়বে।”
পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, রেজাউল ইসলাম ভুইয়া, আলমগীর সিকদার লোটন, এমরান হোসেন মিয়া, মো. আতিকুর রহমান আতিক, শেরীফা কাদের, ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসেন, এইচ এম শাহরিয়ার আসিফ, আমিনুল ইসলাম ঝন্টু, এস এম ইয়াসির ইকবাল হোসেন তাপস, আবু তাহের, আজমল হোসেন লেবু, নুরুন্নাহার বেগম সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান খলিল, মাশরেকুল আযম রবি, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নোমান মিয়া, দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলম, যুগ্ম মহাসচিব এস এম রহমান পারভেজ ও সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে।
Leave a Reply